বাংলা রচনা : বাংলার কৃষক
বাংলার কৃষক
[ রচনা সংকেত : ভূমিকা, কৃষকের জীবন কৃষকের অতীত অবস্থা, দুরবস্থার কারণ, দুর্দশা দূরীকরণের উপায়, জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষকের ভূমিকা, জাতীয় আয় সৃষ্টিতে কৃষক, খাদ্য উৎপাদনে কৃষক, পুষ্টি সমস্যা সমাধানে কৃষক, রপ্তানি আয়ে কৃষক, উপসংহার । ]
ভূমিকা : সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের এ বাংলাদেশ। এদেশের অধিকাংশ লোক কৃষক। কৃষককুলের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে, ত্যাগে, ঘামে গড়ে উঠেছে এদেশের অর্থনীতি। আপন সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়ে তাঁরা জাতির জন্যে কাজ করে যাচ্ছে। দুঃখ-দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে তারা যেভাবে দেশ ও দশের জন্যে কাজ করে যাচ্ছে তার তুলনা নেই। কৃষকের জীবন : কৃষকের জীবন দুঃখে-কষ্টে ভরপুর। অভাব তার নিত্যদিনের সঙ্গী। সে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কঠিন মাটিতে শস্য ফলায়। কিন্তু সেই শস্যের ন্যায্য দাম সে পায় না। সে পায় না উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত অর্থ, পায় না শক্তিশালী বলদ, পায় না ভালো বীজ। সে যা পায় তা হচ্ছে ক্ষুধা, তা হচ্ছে ব্যাধি, তা হচ্ছে শোষণ। বাংলার কৃষকেরা বহুকাল ধরেই শোষণের শিকার। তাদের চাওয়া অত্যন্ত সীমিত। কেবল খেয়ে পরে বেঁচে থাকা। কিন্তু সে বেঁচে থাকার অধিকার থেকেও তারা আজ বঞ্চিত।
কৃষক কারা : যারা কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে তারাই কৃষক। কৃষক কঠিন মাটির বুকে লাঙ্গল চালিয়ে শস্য উৎপাদন করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষক মাঠে কাজ করে। তারা বৃষ্টিতে ভেজে আর রোদে শুকায়। গ্রীষ্মের প্রচ দাবাদাহে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মাঠে কাজ করে। কৃষকের সাথে মাঠের সম্পর্ক, ধানের সম্পর্ক। দিনের পর দিন মাঠে কাজ করতে করতে কৃষক ক্লান্ত অবসন্ন হয়। তারপর যখন মাঠে সোনার শস্য সবুজ শ্যামলিমা ছড়ায় তখন কৃষকের বুক জুড়িয়ে যায়। এর পর শুরু হয় কৃষকের প্রতিক্ষার পালা। গবাদিপশু, পাখপাখালির হাত থেকে অনেক কষ্টে কৃষক তার শস্যকে বাচিয়ে রাখে। এর পর আসে সেই মহেন্দ্র ক্ষণ যখন কৃষক তার ফসল কাটবে। ফসল পেকে গেলে কৃষকের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক দেখা যায়। কৃষাণীর মুখের হাসি দশ দিক আলোকিত করে। কবি নজরুল ইসলাম বলেছেন—
কৃষকের অতীত অবস্থা : কৃষকদের বর্তমান অবস্থা বড়ই করুণ। দেশের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির ফলে কৃষকদের মাথাপিছু জমির পরিমাণ এখন অনেক কমে গেছে। দেশের অধিকাংশ কৃষকই এখন ভূমিহীন। তাই তারা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও স্বনির্ভর হতে পারছে না। উৎপাদিত পণ্যের অর্ধেকই জমির মালিককে দিয়ে দিতে হয়। তাছাড়া বীজ, সার, কীটনাশক ঔষধ ইত্যাদির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা ঠিকমতো তা প্রয়োগ করতে পারে না। অধিকন্তু এখনো তাদেরকে নির্ভর করতে হচ্ছে, সে অস্থিচর্মসার একজোড়া বলদের উপর। ফলে লক্ষ্য অনুযায়ী উৎপাদন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাদেরকে এখনো চড়া সুদে ঋণগ্রহণ করতে হয়। মহাজনের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে তারা জমি, হালের বলদ কিংবা ভিটেবাড়ি বিক্রি করে একেবারে নিঃসম্বল হয়ে পড়ে। কৃষি বাংলাদেশের প্রধান উপজীবিকা হলেও এখানকার কৃষক রোগে-শোকে জর্জরিত। দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রে বাঁধা পড়ে এখানকার কৃষক দুঃখে-কষ্টে অর্ধমৃত অবস্থায় দিন যাপন করছে।
দুরবস্থার কারণ : বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব সাফল্যের ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কৃষি পদ্ধতির দ্রুত উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই আছে। বরং বলা যায় অবস্থার দিন দিন আরও অবনতি হচ্ছে। আমাদের দেশে সেই মান্ধাতা আমলের কৃষি পদ্ধতি এখনো চালু আছে। তাছাড়া আমাদের কৃষকরা শিক্ষার আলো থেকে এখনো বঞ্চিত। তাই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির চাষাবাদ এবং কৃষির আধুনিক যন্ত্রপাতি সম্পর্কে তারা অজ্ঞ। এছাড়া জমিতে সেচ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন এখনো সম্ভব হয়নি। এদেশের ভাগ্যাহত কৃষককুলকে এখনো প্রকৃতির খেয়াল খুশির উপরই নির্ভর করতে হয়। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, মড়ক, বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতিতে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ফসল বিনষ্ট হয়। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হওয়ার ফলে কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থা একেবারে শোচনীয় হয়ে পড়েছে। তাছাড়া নিরক্ষর থাকার ফলেই এদেশের কৃষক সম্প্রদায় নানা প্রকার কুসংস্কার দ্বারা এখনো আচ্ছন্ন। এজন্য তারা অগ্রগতির কোন এজন্য সোপান খুঁজে পাচ্ছে না।
দুর্দশা দূরীকরণের উপায় : বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হলে, কৃষি ক্ষেত্রে বিপ্লব প্রয়োজন। আর এজন্যে কৃষকদের জীবনযাত্রা ও দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ পরিবর্তন প্রয়োজন। কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে। আর কৃষি বাঁচলে আমাদের দেশ বাঁচবে। তাই আর কালবিলম্ব না করে আধুনিক পদ্ধতির চাষাবাদ এদেশে প্রয়োগ করতে হবে। কৃষিক্ষেত্রে যান্ত্রিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে পৃথিবীর বহু দেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। এদেশে যদি তা প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। এজন্যে সবার আগে প্রয়োজন আমাদের অশিক্ষিত কৃষকদেরকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। এ বিষয়ে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষকের ভূমিকা : বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে এদেশের কৃষক রাখে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা। তাদের উৎপাদিত পণ্যে এ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেলে দেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা যায়, ফলে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদনে সঙ্কট দেখা দেয়। কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেলে অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দেশের কৃষি উৎপাদন ভালো হলে অর্থনীতি হয়ে ওঠে সমৃদ্ধিশালী।
জাতীয় আয় সৃষ্টিতে কৃষক : জাতীয় আয় সৃষ্টিতে কৃষক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্যের অধিকাংশ আসে কৃষি থেকে। শিল্পের কাঁচামালের যোগানদাতা বাংলার কৃষক। খাদ্যদ্রব্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যোগায় আমাদেরই কৃষক। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। এভাবে, বাংলার কৃষক এদেশের জাতীয় আয়ে ভূমিকা রাখে।
খাদ্য উৎপাদনে কৃষক : বাংলাদেশের অধিকাংশ খাদ্যের যোগানদাতা কৃষক। ভাত, ডাল, আলু, তরকারি, তৈলবীজ বাঙালির প্রধান খাদ্য। এগুলো সবই কৃষকেরা উৎপাদন করে। কৃষকের উৎপাদিত খাদ্য খেয়েই আমরা বেঁচে থাকি। কৃষক যদি খাদ্য উৎপাদন না করত তাহলে বাংলার মানুষ না খেয়ে মারা যেত। দেশের এক শ্রেণী যারা শহরে বসে দেশকে শাসন করছে; তাদের খাদ্য যোগায় বাংলার কৃষক। বাংলাদেশে মোট চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ২.২০ কোটি একর। এর ৯০ শতাংশ জমিতে খাদ্যশস্য উৎপাদন করা হয়।
পুষ্টি সমস্যা সমাধানে কৃষক : বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকাই গ্রাম। গ্রামের মানুষ পুষ্টিহীনতার শিকার। যথোপযুক্ত পুষ্টিকর খাদ্য তারা পায় না। শহরের মানুষের মধ্যেও অনেকে পুষ্টিহীনতার শিকার হয়ে থাকে। এ পুষ্টিহীনতা দূরীকরণে কৃষকেরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বাংলার কৃষকেরা মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, শাক-সবজি যোগান দিয়ে দেশের মানুষের পুষ্টিহীনতা দূর করতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে।
রপ্তানি আয়ে কৃষক : বাংলাদেশ পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করেই অধিকাংশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। এ পাট কৃষকেরই উৎপাদিত পণ্য। বর্তমানে রপ্তানিজাত পণ্যের তালিকায় নতুন নতুন পণ্যের নাম অন্তর্ভুক্ত হলেও মূলত কৃষিজাত পণ্যই রয়েছে শীর্ষে। রপ্তানি আয়ে বাংলার কৃষক অতীতের ন্যায় বর্তমানেও যথেষ্ট অবদান রেখে চলছে।
উপসংহার : বাংলার কৃষক সমাজ আজ কষ্টের প্রতীক। অথচ দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের ক্ষেতে যে আনন্দের ঢেউ খেলে যায় তার স্বপ্নদ্রষ্টা হচ্ছে কৃষক। দেশের সব মানুষের মুখে যারা অন্ন তুলে দিচ্ছে তারা কৃষক। এদেশের পবিত্র মাটির সঙ্গে : যাদের আত্মার সম্পর্ক, তারা কৃষক। দেশের অর্থনীতির চাকা যারা সচল রেখেছে, তারা কৃষক। কৃষক সমাজের উন্নতির জন্যে তাই আমাদের প্রত্যেকের মনোযোগী হওয়া উচিত।