ইভটিজিং প্রতিরোধে ছাত্রসমাজের ভূমিকা শীর্ষক সেমিনারে একজন বক্তা হিসেবে একটি ভাষণ রচনা করুন
‘ইভটিজিং প্রতিরোধে ছাত্রসমাজের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে একজন বক্তা হিসেবে একটি ভাষণ রচনা করুন।
আজকের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী সেমিনারের সম্মানিত সভাপতি, শ্রদ্ধাভাজন আলোচকবৃন্দ, প্রিয় শিক্ষকবৃন্দ, আমন্ত্রিত সুধীসমাজ ও উপস্থিত সকলে- আপনাদের প্রতি রইল আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ।
আজ একটি অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে আমরা উপস্থিত হয়েছি। প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গায় নানা বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু আজকের এই সেমিনারটি নানা দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘ইভটিজিং’ বা ‘যৌন হয়রানি বর্তমান সময়ের এক জটিল সমস্যা। ইভটিজিংয়ের কারণে প্রায়ই দেশের নানা জায়গায় মেয়ে-ছাত্রী ও নারীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। যৌন হয়রানির কারণে অনেকে আত্মহত্যার মতো পথও বেছে নিচ্ছে। অনেকে স্কুল-কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে রাস্তাঘাটে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা অন্য কোন জায়গায় পুরুষের দ্বারা নারীর প্রতি যে কোন যৌন হয়রানিমূলক আচরণকে ইভটিজিং হিসেবে ধরা হয়। সভ্য যুগে প্রবেশ করে আমরা বোধ হয় আদিম অসভ্য সমাজে আবার ফিরে যাবার চেষ্টা করছি। আমাদের চারদিকের পরিবেশ অসুস্থ করে ফেলছে, দম আটকে আসার মতো ঘটনার খবরে আমরা গভীর উদ্বিগ্ন। এই সংকট মোকাবেলায় ছাত্রসমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে আমরা মনে করি।
সুধীসমাজ,
নারীর প্রতি সহিংসতা আর নিপীড়ন নতুন কোন বিষয় নয়। যুগে যুগে তারা অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার। ইভটিজিং তারই বর্তমান ফল। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী। মেয়েদের মেধা ও যোগ্যতাকে স্বীকৃতি না দিয়ে তাদের কেবল ভোগের সামগ্রী হিসেবে গণ্য করায় ইভটিজিংয়ের মতো নোংরা ঘটনার জন্ম হয়েছে। বখে যাওয়া ছেলেরা এই ধরনের ঘটনা বেশি ঘটাচ্ছে। তাদের ওপর পরিবারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, মা-বাবার বাধ্য নয় তারা । ইভটিজিংয়ের মতো ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তারা হয়তো আমাদের বিপথগামী ভাই কিংবা সন্তান, আত্মীয় অথবা পাড়া- প্রতিবেশি স্বজন। ইভটিজিংয়ের সঙ্গে তরুণ-যুবকরা ছাড়াও মধ্যবয়সী বিকৃত রুচির কিছু লোকও জড়িত।
প্রিয় শ্রোতাবৃন্দ,
ঘরের বন্দিদশা কাটিয়ে মেয়েরা যখন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-অফিস-আদালত ও বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে যাওয়া শুরু করে ইভটিজিংয়ের ঘটনা তখন থেকেই বেশি পরিমাণে ঘটতে শুরু করে। অনেক মূর্খ অশিক্ষিত পুরুষ ইভটিজিংয়ের জন্য মেয়েদের খোলামেলা পোশাককে দায়ী করে। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে দেখা গেছে শালীন রক্ষণশীল পোশাক পরিহিত মেয়েরাও ইভটিজিংয়ের শিকার হয়। অনেক নারীবাদী সংগঠন এই ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিন্তু আমরা মনে করি এটা নারীদের একার কোন ব্যাপার নয়। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে আমাদের সবাইকে। বিশেষ করে ছাত্রসমাজকে এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। তারা পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে পরিবার ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রচারণা চালাতে পারে। সরকারকেও এ কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সচেতনতামূলক কবিতা, গান, পোস্টার প্রদর্শনী, ডক্যুমেন্টারি, জারি গান ইত্যাদি আয়োজনের মাধ্যমে ছাত্ররা তৈরি করতে পারে ব্যাপক সচেতনতা ।
সম্মানিত সুধীবৃন্দ,
ইভটিজিং বর্তমানে একটি মারাত্মক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এর হাত থেকে কীভাবে রেহাই পাওয়া যায় আমাদের সেই উপায়ই বের করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনিকে কঠোর হতে হবে এর প্রতিরোধে। এর পাশাপাশি ইভটিজারদের আমরা বয়কট করে চলবো। তারা কেন এধরনের আচরণ করে সরকারকেও তার কারণ খুঁজে দেখতে হবে। তাদের ভালো পথে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারেরও একটি নৈতিক দায় রয়েছে।
প্রিয় সুধীজন,
সময় এসেছে আমাদের নারীদের প্রতি আরও শ্রদ্ধাশীল হবার। পরিবার থেকেই এই শিক্ষা শুরু করতে হবে। কোন মৌলবাদী ধর্মান্ধ ফতোয়া দিয়ে যাতে নারীদের হেয় করা না হয় সেদিকে সরকারের বিভাগগুলোর খেয়াল রাখতে হবে। বেশি বেশি করে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের চর্চা করতে হবে। খেলাধুলা, চিত্তবিনোদন ও সৃষ্টিশীল নানা কাজের সঙ্গে তরুণ সমাজকে সংযুক্ত করতে হবে। বেকার সমস্যা সমাধানেরও কোনো বিকল্প নেই । কাজের সুযোগ থাকলে এই ধরনের নোংরা ঘটনা কমে আসবে। আমাকে এরকম একটি সেমিনারে বক্তব্য রাখার সুযোগ দিয়ে আমাকে আপনারা সম্মানিত করেছেন। তাই আপনাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমার কথা এখানেই শেষ করলাম। ভালো থাকবেন সবাই ।
