বাংলা রচনা : একটি জ্যোৎস্না প্লাবিত রাত্রি

একটি জ্যোৎস্না প্লাবিত রাত্রি
বাংলা রচনা : একটি জ্যোৎস্না প্লাবিত রাত্রি


একটি জ্যোৎস্না প্লাবিত রাত্রি
অথবা, একটি স্মরণীয় পূর্ণিমা রাত
 অথবা, একটি পূর্ণিমার রাত
অথবা, একটি চাদনি রাত


[সংকেত : ভূমিকা; চাদনি রাতের আবির্ভাব; চাদনি রাতের প্রকৃতি; মানবমনে চাদনি রাতের প্রভাব; চাদনি রাতের প্রকৃতি; মানবমনে চাঁদনি রাতের প্রভাব; চাদনি রাত গানের রাত; একটি চাদনি রাতের অভিজ্ঞতা; উপসংহার ।]

ভূমিকা : জ্যোৎস্না রাত আলােকময় প্রকৃতির এক বৈচিত্র্যময় উপহার। ভরা পর্ণিমার রাতে নিটোল চাদ তার ঝলমলে আলাের পসরা নিয়ে উপর আকাশে আবির্ভূত হয়। রুপালি জ্যোৎস্নার অনিন্দ্য সৌন্দর্যে অনবদ্যরূপে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সমগ্র নিস নয়। চাদনি রাত প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের মনে বিচিত্র ভাব ও উদ্দাম আনন্দের সঞ্চার করে। চাদনি রাতের নৈসগিক পরিবেশ যেমন দৃষ্টিনন্দন, চিত্তাকর্ষক তেমনি উপভােগ্য। এ রাতে প্রকতি মায়াবী রূপ-মাধুর্যে ভরে ওঠে। পূর্ণিমা নিশিতে নির্জন অরণ্যের আলো-ছায়া জড়ানাে পথে ঘুরে বেড়ানাে— আহ! ভাবতেই মনটা কেমন অনির্বচনীয় আনন্দে রােমাঞ্চিত হয় । কবির ভাষায়—


শান্ত করাে, শান্ত করাে এ ক্ষুব্ধ হৃদয়
হে নিস্তব্ধ পূর্ণিমা যামিনী । অতিশয়
উদ্ভ্রান্ত বাসনা বক্ষে করিছে আঘাত
বারংবার তুমি এসাে সিন্ধু অশ্রুপাত
                               দগ্ধ বেদনার পরে। 


চাঁদনি রাতের আবির্ভাব : শুক্ল পক্ষের প্রতিপদ থেকে শুরু করে এক এক কলা বুদ্ধি পেতে পেতে পঞ্চমীতে এসে চাদের ষোলােকলা পূর্ণ হয়। সেদিন দিবাগত সন্ধ্যার অন্ধকার কেটে বন-বৃক্ষরাজি, নদী-নালা, প্রকৃতি ভেদ করে চাদ তার উজ্জ্বল স্নিগ্ধ আলাে ছড়িয়ে দেয়; আর সঙ্গে সঙ্গে দশদিক খুশিতে ঝলমল করে ওঠে। ঝলমল করে দিঘির জল, টিনের চালা, নারকেলের পাতা। শুক্ল পক্ষের পঞ্চমীই পূর্ণিমা। পঞ্চমীর রাতে নিশিপতি চাদ তার পূর্ণ শশাভা নিয়ে আকাশে আলাের আসর জমায়। সারারাত জ্যোৎস্নার বাধভাঙা হাসি হাসে রূপ-বিলাসী পূর্ণ শশধর । জ্যোৎস্নার অনুরাগে বিহ্বল হয়ে ওঠে বসুন্ধরা । মৌন প্রকৃতির বুকে জেগে ওঠে বিচিত্র অনুভূতি। সমগ্র প্রকৃতিকেই যেন মনে হয় একটি বাঅয় মূর্ত কবিতা। জ্যোৎস্নার চুমু খেয়ে প্রকৃতি স্বতন্ত্র বৈচিত্র্য নিয়ে স্বপ্নীল হয়ে ওঠে। সৃষ্টি যেন স্বপ্নে কথা বলার বাসনায় উন্মুখ । শুধু মানব মনে নয়, বিপুলা পৃথিবীর সর্বত্রই অব্যক্ত ধ্বনির পুঞ্জ। উন্মত্ত আনন্দের জোয়ার। 

চাঁদনি রাতের প্রকৃতি : আলাে-আঁধারের স্নিগ্ধ মিতালিতে ঝলমল করে ওঠে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাত। এমন রাতে অস্পষ্ট মায়ালােকে নিমজ্জিত থাকে প্রকৃতি। প্রকৃতির পরতে পরতে ছড়িয়ে পড়ে এক কোমল পরশ । শরতের নির্মেঘ আকাশে অথবা বৈশাখী পূর্ণিমার মেঘহীন আকাশে তারার ফুলঝুরি ফোটে । নদীর ধারের কাশবন দূর থেকে দেখলে মনে হয় সাদা কাশফুলের সাথে চাদের রুপালি আলাের মিতালি ঘটেছে। আবার মনে হয়, যেন শুভ্র বসন পরিহিত পরির দল নেচে নেচে চাদনি রাতকে স্বাগত জানাচ্ছে। আলােয় স্নাত প্রকৃতি যেন সেজেগুজে কার প্রত্যাশায় তৈরি হয়ে থাকে। বনে-বাগানে, পথে-প্রান্তরে, আকাশে-বাতাসে সৌন্দর্য, আনন্দ ও উচ্ছলতা ছড়িয়ে পড়ে। চারদিকেই আলাের শিহরণ, প্রাণের চাঞ্চল্য বিরাজ করে। আলােয় আলােয় দিক-দেশ-প্রান্তর হেসে ওঠে । আলাের আল্পনায় অপরূপ হয়ে ওঠে প্রকৃতিকন্যা । জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ে নদীর জলে, কাশ বনে, শেফালি বনে, পদ্মঝাড়ে । আলােয় ভরা চাঁদের তরী হালকা মেঘের পাল তুলে ভেসে-বেড়ায় আকাশ গঙ্গায়! শ্যামল প্রকৃতি জ্যোৎস্নার প্রাবনে ডুবে যায়। প্রশস্ত নদীর ঘােলা জলে চাদের আলাে ঝিলমিল করে । চাদ জলের আয়নায় তার মুখ দেখতে চায় কিন্তু ঢেউয়ের দোলায় তার শঙ্গার-বিলাসে ব্যাঘাত ঘটে। তখন এক চাদ নদীর জলে শত চাদ হয়ে দোল খায়। ধানের ঘনসবুজ নত পল্লব শিশির স্নাত, চাদের আলােয় তা মুক্তার মতাে চিকচিক করে । এত রূপ, এত বৈচিত্র্য, এমন গভীর মূরতি, স্নিগ্ধ সজল সুহাসিনী রাত একমাত্র পর্ণিমার জ্যোৎসালােকেই প্রত্যক্ষ করা যায় । জ্যোৎস্না বিধৌত প্রকৃতিতে দুচোখ রেখে মুগ্ধ বিস্ময়ে আত্মবিমােহিত কবি তাই গেয়েছেন—

চাদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে উছলে পড়ে আলাে,
ও রজনীগন্ধা, তােমার গন্ধসুধা ঢালাে ॥ 


মানবমনে চাদনি রাতের প্রভাব : চাদনি রাতের মােহনীয় রূপ-সৌন্দর্য প্রতিটি মানুষের মনেই রং ধরায়। সুখ-শয্যায় ঘুম আসে না, অথচ ঘুম না আসার কোনাে গ্লানিও অনুভূত হয় না। কেমন যেন বুকের তলে জমা হয়, অথচ সেই ভাব প্রকাশের ভাষা নেই । মূলত জ্যোৎস্নার মায়াবী রূপ মানুষের মন দেয়, রাঙিয়ে তােলে মানুষকে। সৌন্দর্যপিপাসু মানুষ এমন মাতাল জ্যোৎস্নায় ঘরে থাকতে পারে না অবগাহন করে ধন্য হয় । তাই কবি লিখেছেন一


আজ যাব না যাব না যাব না ঘরে
বাহির করেছে পাগল মােরে ।
বনের বিজনে মৃদুল বায়
দুলে দুলে ফুল বলে আমায়
ঘরের বাহিরে ফুটিবি আয়
পুলক ভরে।

জ্যোৎস্নার আলাে-ছায়ার নৃত্যে প্রকৃতিপ্রেমী নিসর্গবিলাসীর শিরা-উপশিরা দুলে ওঠে । আলাের চুম্বনের দাগ প্রকৃতির অধরে । চাদের মায়াবী আলােয় রাতকে দিন বলে ভ্রম হয়। এমন স্বগীয় সৌন্দর্যমণ্ডিত রাত মানুষের সমস্ত প্রয়ােজনের অতীত । এ যেন কেবল অকারণ আনন্দ উপভােগের জন্য উদযাপিত । সমস্ত কর্মচাঞ্চল্যের অবসানে, স্বার্থমগ্ন জগৎ-সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এ যেন পরম এক শৈল্পিক উপলব্ধি; এক সুন্দর স্বভাব বিরহের মধুরতা । তখন যেন কোন হৃত-জন-মুখ চাদের অবয়বে ফুটে ওঠে আর উচাটন মনে অবদমিত বেদনায় গানের কলি বাজে—

আজি জ্যোৎস্নার পরশনে
কার কথা পড়ে মনে ।


না -বলা কথার ধ্যান মৃদঙ্গধ্বনির মতাে কেবল বাজতেই থাকে। বাজতে থাকে অনন্তকালের সেই অতৃপ্ত বাসনার অশ্রুভারাতুর সুর

কত দিন দেখিনি তােমায়
তবু মনে পড়ে তব মুখখানি ।


কারও আবার মনে পড়ে শৈশবে ফেলে আসা সেইসব সােনালি দিন । মনে পড়ে দিদি-ঠাম্মার কোলে বসে শােনা চাদ বুড়ির চরকা। কাটার গল্প। 

এমন বহুমিশ্রিত আবেগ-অনুভূতিতে ভরে ওঠে মানুষের মন। তাই বলা যায়, চাদনি রাত অনুভূতিপ্রবণ স্মৃতিকাতর মানুষের মনে ব্যাপক ও গভীর প্রভাব বিস্তার করে। মানুষ আকুলতার আতিশয্যে বাস্তবতার গণ্ডি পেরিয়ে পরাবাস্তব কল্পনার আনন্দলােকে হারিয়ে যায় ।

চাঁদনি রাত গানের রাত : চাঁদনি রাতের উপভােগ্য দৃশ্য বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে আছে। তাই আমাদের গানেকবিতায়-গল্পে চাঁদের প্রসঙ্গ আসে বারবার। এমনি রাতে কবিরা কবিতার উপকরণ খুঁজে পান । গানের সুর ফুটিয়ে তােলার জন্য এমন রাত বড়াে পয়মন্ত । চাঁদনি রাতে সবার প্রাণেই গানের সুর বেজে ওঠে । তাই প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম চাঁদনি রাত নিয়ে গেয়েছেন

প্রিয় এমন রাত যেন যায় না বৃথায়,
মালা-চন্দন ফুলে ওই বাসর সাজাই। 


চাঁদনি রাতকে যুগে যুগে বহু কবি বিভিন্নভাবে বরণ করেছেন । জ্যোৎস্নার সৌন্দর্য কত কবির মনে ভাবােপলব্ধির বন্যা বইয়েছে, তাঁরা সেই ভাবের ফসল রেখে গেছেন গানে-কবিতায় । জ্যোৎস্নার মাতাল নেশায় মনের মধ্যে ছন্দ-সুর খেলা করে। সে খেলায় মত্ত হয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গেয়েছেন

আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে। 


একটি চাঁদনি রাতের অভিজ্ঞতা : পৌষের কুয়াশাচ্ছন্ন চন্দ্রালােকিত গভীর রাত্রি । সমগ্র বিশ্ব দ্রিামগ্ন । কোথাও কোনাে সাড়া নেই। দূর-দিগ্বলয় পানে তাকালে মনে হয় রুপালি জ্যোৎস্নায় কুয়াশার সাদা বসন পরে বৈধব্যবেশী কোনাে নারী দাঁড়িয়ে আছে! রাত্রির নিস্তব্ধতা চৌচির করে দূরে দু'একটি কুকুরের চিৎকার । পূর্ণ চাদের নিথর রাত্রির বুকে আমি একা জেগে । একেবারে একা নিঃসঙ্গ অনিকেত । রজতধারায় ঝরনার মতাে চাঁদের রূপ পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ছে। আমার চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে । আমি ক্রমাগত গভীর উপলব্ধির অতলে ডুবে যাচ্ছি । অনন্তকাল ধরে চাদ তার আলাে ছড়াচ্ছে। শুধু একটি রাত আমি তার চলমান প্রক্রিয়ার সাথি হয়ে আছি । মহাকালের অসীম কালচক্রে এই রাত, এই দুর্লভ সুন্দর মুহূর্ত আর তাে ফিরে আসবে না । আসবে অন্য চাদনি রাত কিন্তু এই রাত তাে চিরতরেই বিগত হবে । এসব ভেবে আমার ভিতরে একটি অনির্বচনীয় শিহরণ জেগে উঠছে। কী জানি এমন ভাব। থেকেই কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লিখেছিলেন কি না—

এমন চাদের আলাে।
মরি যদি সেও ভালাে
সে মরণ স্বর্গ সমান । 

সন্ধ্যায় যে চাঁদ ছিল পূর্ব গগনে, এখন সে পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। অথচ আমার ভিতরে কত সুধা, কত বেদনাই না সে জাগিয়ে। তুলছে । আনন্দ-বেদনায় বিগত দিনের স্মৃতি রােমন্থন করে আমার ভিতরে একটা গুমড়ে মরা অবরুদ্ধ আবেগ কান্না হয়ে বেরােতে চাচেছ । আমার চারপাশে একটা নিবিড় শান্তি বিরাজ করছে। পাশের বেত বনে ডাহুকি বিরহী হৃদয়ের আকুল কান্নায় ব্যথার রাগিণী জাগিয়ে তলচ। প্রকতির মনোেহর রূপ-মাধুর্যের লাস্যময়-হাস্যময় স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের গভীরে আমার তনুমন সমর্পিত হয়ে আছে। চাদনি। রাতের অন্ধ ভরে বিরহী পাখির করুণ সুর আমার মগ্ন চৈতন্যে সহসা বেদনার ছোঁয়া দিয়ে গেল । পবিত্র এক পরিবেশ শুভ্রতার চাদর গায়ে দিয়ে সজাগ জীবনবােধে আমার হৃদয়ের গভীরে নাড়া দিয়ে গেল। আমার কোনাে মালিন্য নেই; নেই কোনাে সাংসারিক দুশ্চিন্তা। জাগ্রত এই রাত আমাকে অনাবিল অনিন্দ্য ভুবনের মহিমাদীপ্ত জ্যোৎস্না-স্নিগ্ধ প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। 

উপসংহার : চাঁদনি রাতের স্বতন্ত্র একটি রূপ-বৈচিত্র্য আছে। এমন রাতের সৌন্দর্য উপভােগ ও অবলােকন করা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। এ সৌন্দর্য-সুধা পান করতে চায় ভাবুক মন। চাঁদের আলাে শুধু পৃথিবীকেই আলােকিত করে না, ক্ষণিকের তরে হলেও আলােকিত করে সৌন্দর্যপিপাসু মানুষের মনকে। বিশেষ করে ভাবুক মনে জ্যোৎস্না বপন করে সৌরভ স্নিগ্ধতার বীজ। চাঁদনি রাত আমাদের ভিতরে বহুমাত্রিক উপলব্ধিকে জাগিয়ে তােলে। সে উপলব্ধি যেমন ব্যাপক তেমনি বিচিত্র; যেমন গভীর তেমনি অন্তর্মুখী সূক্ষ্মানুভব। বিষন্নতার বাহনে চড়ে বিমল সুন্দর যেমন মূর্তরূপ ধারণ করে তেমনি সৃষ্টিশীল সত্তায় স্বভাব বিরহ অশ্রান্ত অনুরণী হয় । নির্মোহ আনন্দের আতিশয্যে মানুষ মৃত্যুকে বন্ধুর মতাে হাসি মুখে জড়িয়ে ধরে। কেননা, আত্মার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হলে, মৃত্যুতেও মহাতৃপ্তি বিরাজ করে। আর তা যদি হয় স্বর্গীয় সুন্দর কোনাে মুগ্ধ পরিবেশ, তাহলে তাে কথাই নেই। তাই কবি জন কিটস বলেছেন—


তােমার পদে এ মিনতি করি দয়াময়,
আমার মরণ যেন চাঁদনি-রাতে হয়।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url