তোমার প্রিয় শিক্ষকের বিদায় দিনের দিনলিপি
তোমার প্রিয় শিক্ষকের বিদায় দিনের দিনলিপি ।
১ জানুয়ারি, ২০২৬প্রত্যেকের জীবনেই কোনো একটি দিন আসে যেদিনের কথা মনে হলে বেদনা ও বিষণ্নতার স্মৃতি জেগে ওঠে। ১ জানুয়ারি দিনটি আমার জীবনে তেমনি একটি দিন। সব থেকে কাছের, সব থেকে প্রিয় মানুষটিকে আজ হারিয়েছি আমি। আমার ভালোলাগার শিক্ষক অশোক স্যারের কথা বলছি। অশোকতরুর মতোই আমার জীবনে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়েছিলেন স্যার। ধনী ঘরের সন্তান ছিলেন বলেই শুনেছি, শখের বশে এসেছিলেন শিক্ষকতা করতে— স্যার বলতেন ‘মাস্টারি' । একাত্তরে যুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য। কারো বাধা মানেননি। স্কুলের উজ্জ্বল মেধাবী ছাত্র ছিলেন। বড় চাকরির লোভ ত্যাগ করে চলে গেছেন লড়াইয়ের মাঠে। গ্রামে জমিদারের ছেলে বলেই সবাই ডাকত। জমি-জমা, খেতি-খোলা ছিল অজস্র। সেজন্যই বোধ হয় ‘জমিদার’ সম্বোধন। ব্রিটিশ আমলে সত্যিকারের জমিদারি ছিল তাঁদের। এখন জমিদারি নেই, কিন্তু নামটি আছে। গ্রাম থেকে প্রথম যেদিন শহরের কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম সেদিন খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম । শহুরে ছেলেদের মতো চটপটে নই আমি, পোশাক-আশাকও সাধারণ মানের। ফর্সা তক্তকে টাকাওয়ালা ছেলেদের দেখে বুক কাঁপতো। অন্য কেউ নয়, কোনো সহপাঠি বন্ধু নয়— আমার প্রিয় অশোক স্যারই সেদিন ধরতে পেরেছিলেন আমার এই অসহায়ত্বটা। হাতের ইশারায় কাছে ডেকে নিয়েই জিজ্ঞাসা করেন কোত্থেকে এসেছি। গ্রামের নাম শুনে বললেন চিন্তার কারণ নেই আমিও গ্রামেরই মানুষ। এক মুহূর্তেই ভরসার একটি জায়গা পেয়ে গেলাম। সেই ভরসা পরিণত হলো পরম মমতা, শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব আর ভালোবাসায়। ক্লাশে খুব প্রাণবন্ত ছিলেন স্যার। সাহিত্যটা ভালো জানা ছিল তাঁর। তার চেয়ে বেশি জানতেন জীবনের গল্প । কতো গল্পের ভাণ্ডার যে তাঁর মধ্যে ছিল তার হিসেব নেই। দেখতে দেখতে দুটি বছর কেটে গেল। একদিন কলেজে গিয়েই শুনলাম আমাদের সবার প্রিয় অশোক স্যার বদলি হয়ে চলে যাচ্ছেন। কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। যশোরে পৈত্রিক বাড়ি স্যারের। সেখানেই নামকরা একটি কলেজে বদলি হয়েছেন স্যার। চাকরি জীবনের শেষ দিনগুলো বাড়ির কাছেই কাটাতে চান তিনি ।
বিদায় অনুষ্ঠানে ছিল এক গভীর বিষণ্নতা। অধ্যক্ষ মহোদয় অশোক স্যারের অনেক প্রশংসা করলেন। প্রশংসা করলেন তাঁর প্রজ্ঞার। কিশোর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে যে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন সে কথাই বারবার আসলো সবার কথায়। অশোক স্যার যাবার আগে আমাকে কিছু বই উপহার দিয়ে গেছেন। সেগুলো পড়ার টেবিলে রেখেছি। বইগুলো দেখলেই স্যারের কথা মনে পড়ছে।
